মোশাররফ হোসেন : একজন শাম বেনেগাল যে কতটা বিশ্বমানের পরিচালক তার কাজের সূক্ষ্মতা ও অভিনেতা, অভিনেত্রীদের কাছ থেকে অভিনয় আদায়, দৃশ্যায়ণ এবং কাহিনীর ধারা তুলে ধরে তা তাতে দর্শকদের টেনে নেয়ার যাদুকরি কৌশল মিলে “মুজিব, একটি জাতির রূপকার, Mujib. a making of a nation, Mujib biopic এককথায় অসাধারণ ও ঐতিহাসিক ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। তখন রাত সাড়ে ১১টা।
টানা ২ ঘন্টা ৫৮ মিনিট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক, বাংলাদেশের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনভিত্তিক ছবিটি বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় টরেন্টোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ভেনূ ৩৫০কিং স্ট্রীট ডাউনটাউনের বেল লাইট বক্স সিনে ৭ হলে প্রদর্শিত হয়। আমন্ত্রিত শিল্পী, টরেন্টোর সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী,৷ চলচ্চিত্র নির্মাতা ভারত ও বাংলাদেশের অতিথি ছাড়াও টরেন্টোর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজক, ছবিটি দেখার পর বললেন, একটি জাতির রূপকার, ছোট্ট একটি অজপাড়াগাঁ থেকে দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে উঠে আসা এবং দেশ উপহার।
আবার সপরিবারে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা বিশ্বে আর ঘটেনি। একথায় অসাধারণ এক ছবি “মুজিব একটি জাতির রূপকার।” বার বার দেখে যার সাধ পূরণ হবেনা।
যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা গৌরি যমুনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান। ছবিটি বাঙালি জাতিকে চিরকাল উজ্জীবিত করবে।১৯৭০ সালে জহির রায়হান এর ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’ সাধীকার আদায়ে উজ্জীবিত করেছিল।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ডঃ হাসান মাহমুদ টরেন্টো এসেছেন দুই দিন আগে। এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজরাত ইয়াসমিন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কাওসার আহমেদ এবং শিল্পী আরেফিন শুভ ও ফারিয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ছবির চিত্র নাট্যকার অতুল তিওয়ারি ও সচিত্র শর্মা ভারতে র প্রতিনিধিত্ব করেন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ডঃ হাসান মাহমুদ বলেন, ছবিটির বিশ্বজুড়ে প্রদর্শনীর উদ্যোগ নিয়েছে ভারত ও বাংলাদেশ। টরেন্টোয় প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখলাম। এখন আগামী অক্টোবরে বাংলাদেশে প্রদর্শিত হবার সম্ভাবনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছবি তৈরির কাজে পৃষ্ঠপোষক শুধু নয়, বঙ্গবন্ধুর জীবন সংগ্রামের সকল বিষয়ে ছবির পরিচালক শাম বেনেগাল ও কাহিনীকারকে সহযোগিতা করেছেন। ভারত ও বাংলাদেশে ছাড়পত্র পেয়েছে ছবিটি।
অতুল তিওয়ারি বলেন কাহিনী লিখে তার চিত্রনাট্য তৈরি করতে একবছর লেগেছে। শুটিং হয়েছে একবছর ভারত ও বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গাতে। সূচনাপর্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ডঃ খলিলুর রহমান, চিত্রনাট্যকার অতুল তিওয়ারি , অভিনেতা আরেফিন শুভ নুশরাত ফারিয়া, সচিত্র শর্মা সবাইকে ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশ কনসুলেটের কনসাল জেনারেল লুৎফর রহমান ও তার অফিস কর্মকর্তাবৃনদ লজিসটিক দায়িত্ব পালন করেন।

ছবিটির চুম্বক অংশ:
মুজিব একটি জাতির রূপকার ছবিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চরিত্রে আরেফিন শুভ, বেগম ফজিলাতুন নেসা মুজিব রেণু চরিত্রে নুশরাত ইমরোজ তিশা, শেখ হাসিনা , (নুশরাত ফারিয়া) শেখ লুৎফর রহমান (চঞ্চল চৌধুরী) মাওলানা ভাসানী (রাইসুল ইসলাম আসাদ), হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদী ( তৌকির আহমেদ), তাজউদ্দীন আহমেদ (রিয়াজ), খন্দকার মোশতাক ( ফজলুর রহমান বাবু) বঙ্গবন্ধুর মাতা (দিলারা জামান) চরিত্র রূপদান করেছেন।
ছবিটির সূচনা ১০ জানুয়ারি 1972 বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন দিয়ে। অতঃপর মুজিবুর রহমানের শৈশব কাল। বঙ্গবন্ধুর সংগে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওর্যাদীর দেখা। টুংগিপাড়া ইস্কুল সংস্কার নিয়ে আলাপ ও দৃষ্টিতে আসা। মধুমতি নদীতে নৌকাতে চড়ে অজপাড়া গাঁয়ে আগমন দৃশ্য, ছেলেমেয়েদের ছোটাছুটি, নারীদের দলবদ্ধ নৃত্য অসাধারণ ভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
তারপর মুজিবুর রহমানের কোলকাতা পড়তে যাওয়া, রেণুর সাথে বিয়ে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ারদীর বাড়িতে যাওয়া, রাজনৈতিক জীবনের শুরু, আওয়ামী মুসলিম লীগ করা, মাওলানা ভাসানী সংগে কাজ করা
জেলে যাওয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের অধিকার নিয়ে আন্দোলন, জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বক্তৃতায় উর্দুকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা ঘোষণার পরই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা ও মিছিলে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবী। পরবর্তীতে ১৯৫২সালের ২১ফেব্রুয়ারি গুলিতে সালাম বরকত রফিক, জব্বারের মৃত্যু, ১৯৬৬র ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও জেল,১৯৬৯সালে ছাত্র জনতার গণঅবভুথানে মুক্তি , ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের নির্বাচনে ১৬৭আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়াখানের ষড়যন্ত্র, সংসদ ডেকে আবার স্থগিত, ৭ মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা, মুজিবকে ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতার, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ বিভিন্ন জায়গায় গুলি, বোমা , রাজারবাগ পুলিশ সদরদফতরে গুলি, পিলখানা আক্রমণ, নজরুল ও তাজউদ্দীন সহ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ও প্রধানমন্ত্রীরসহ বাংলাদেশ সরকার গঠন ও শপথ গ্রহণ। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু ১১টি সেক্টরে । ভারতে দুইকোটি শরণার্থী, বাংলাদেশজুড়ে গণহত্যা, ১২দিনের ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ, ভারতীয় ছত্রীসেনা টাঙ্গাইল ও কুমিল্লার নামার পর ঢাকা ঘিরে ফেলা, জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও মুক্তিবাহিনীর অগ্রবর্তি বাহিনীর কাছে সোহরাওয়ারদী উদ্যানে ৯০হাজার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বে আত্মসমর্পণ, বাংলাদেশের বিজয়। পরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কতৃক মুজিবুর রহমানকে ফিরিয়ে দেওয়ার শর্তে পাকিস্তানের আটক সেনাবাহিনীর সকলকে ফেরত দিয়েছেন। বেগম মুজিব হাসিনা, রেহানা, শিশু রাসেলকে বিজয়ের পর ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক উদ্ধার ও বেগম ফজিলাতুন নেসা রেণুর আটকৃত বাড়ির ছাদে বাংলাদেশের পতাকাকে অভিবাদন ও জয় বাংলা শ্লোগান, ১৯৭৫সালে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাকশাল গঠন, অস্থায়ী এ ব্যবস্থার ফলাফলের অপেক্ষা না করে দেশ ও বিদেশের ষড়যন্ত্রের ফলে সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চাভিলাসী কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২নম্বর বাড়িতে ঢোকার পর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে শিশু রাসেল সহ হত্যা করে। এ ঘটনার সংগে জিয়াকে ষড়যন্ত্রের সংগে জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে। কলংকজনক হত্যার পর নেপথ্য গান-হায়রে বাঙালি… কী হারাইলি, প্রতিটি অংশ দৃশ্যায়ণ অসাধারণ ভাবে উপস্থাপন করেন শাম বেনেগাল। এখানেই সার্থকতা। সত্য, সুন্দর ও অসাধারণ ছবি।