নির্মাণের পর থেকেই নানা সমস্যায় জর্জরিত যশোর সুইমিং পুল। তা পড়ে রয়েছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। একেকটি উদ্যোগে নবীন পুরাতন সাতারু ও কর্মকর্তারা এই আশান্বিত হন তো খানিক পরেই হয়ে পড়েন আবার আশাহত। ঠিক এমন আশা নিরাশার দোলে চলছে যশোর সুইমিং পুল।
প্রেক্ষাপট বলছে, ২০০৫ সালে এনএসসির অর্থায়নে যশোরে আন্তর্জাতিকমানের সুইমিংপুল নিমার্ণ শুরুর পর উদ্বোধন করা হয় ২০০৮ সালে। এরপর ২০১১ সালে প্রায় চার লাখ টাকা বিল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ২০১৭ সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থার পক্ষ
থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর একে সংস্কার করে ফের ২০১৮ সালে চালু করে পৌরসভা। সুইমিংপুলে লেন নেই। নেই ময়লা পরিষ্কারের জন্য নেট ও ভ্যাকুয়াম মেশিন। সুইমিংপুলটি জাতীয় মানের নয়। প্রতি সপ্তাহে পানি পরিবর্তন করতে হয়। এজন্য সপ্তাহে ২দিন পুলটি বন্ধ রাখতে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, এটি রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই।
করোনা লকডাউন শেষে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সুইমিংপুল। এই পুল ঘিরে যশোর থেকে জাতীয় মানের সাঁতারু
তুলে আনার পরিকল্পনা করছেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা। যদিও কিছু সমস্যা এবং সঙ্কটে পুলটিকে চালু রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারেরও পদক্ষেপ জরুরি।
যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা সূত্র জানায়, ২০০৫ সালে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) অর্থায়নে যশোরে আন্তর্জাতিকমানের সুইমিংপুল
নিমার্ণের কাজ শুরু হয়। চার কোটি টাকা ব্যয়ে নিমিত সুইমিংপুলটি ২০০৮ সালের মাঝামাঝি উদ্বোধন করা হয়। এরপর চার বছর জেলার সাঁতারুদের প্রশিক্ষণ বেশ ছিল। সে সময় কয়েকটি টুর্নামেন্টের আয়োজন দৃষ্টি কাড়ে। ফলে সুইমিংপুল ঘিরে সাতাঁরুদের আনাগোন ছিলো উল্লেখ করার মত। কিন্তু ২০১১ সালের মাঝামাঝি প্রায় চার লাখ টাকা বিল বকেয়া থাকায় সুইমিংপুলের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। তারপর গত আট বছর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সুইমিংপুলটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি তৎকালীন জেলা প্রশাসক হুমায়ুন কবির পুলটির রক্ষাণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেন পৌরসভাকে। দায়িত্ব পেয়ে সুইমিংপুলটিকে সংস্কার করে পৌরসভা। সংস্কার শেষে ২০১৮ সালের শেষদিকে পুলটি উন্মুক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে করোনাকাল পেরিয়ে আবার সচল যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সুইমিংপুল। গত মার্চ থেকে সাঁতারুদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে
সুইমিংপুল। পুলে সাঁতার শিখতে আসা তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র অরণ্য দেবনাথ অর্ক জানায়, পুকুর, নদী, সাগরে নেমে যেন ডুবে না যায়, সেজন্য সে সাঁতার শিখছে। আর ভালোভাবে সাঁতার শিখে সে প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও জিততে চায়।
সন্তানকে সাঁতার শেখাতে আগত মা এ্যাড. স্বপ্না তরফদার জানান, সাঁতার শেখাটা প্রত্যেক বাঙালীর জন্য জরুরি। এজন্য তিনি তার মেয়ে ও ভাইপোকে সাঁতার শেখাতে নিয়ে এসেছেন। সুইমিংপুলটি সাঁতার শেখার জন্য মোটামুটি ভাল।’ তবে তিনি প্রশিক্ষক বৃদ্ধি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন।
সাঁতার প্রশিক্ষক মো. গোলাম মোস্তফা জানান, ‘সুইমিংপুলে লেন নেই। নেই ময়লা পরিষ্কারের জন্য নেট ও ভ্যাকুয়াম মেশিন। সুইমিংপুলটি জাতীয় মানের নয়। ভাল মানের পুলে বয়লার সিস্টেম থাকে। যার মাধ্যমে পানি রিফাইন করে ব্যবহার করা যায়। এখানে সে ব্যবস্থা নেই। আর এখানে পানিতে আয়রন হয় বেশি। প্রতি সপ্তাহে পানি পরিবর্তন করতে হয়। এজন্য সপ্তাহে দুদিন পুলটি বন্ধ রাখতে হয়।
যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাতাঁর পরিষদের সভাপতি এ্যাড. নজরুল ইসলাম জানান, ‘করোনার পর মার্চ থেকে সুইমিংপুল চালু করা হয়েছে। নতুন নতুন সাঁতার প্রশিক্ষণার্থী আসছে। তবে পুলটি চালু রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পানি উত্তোলন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা, পানি ভাল রাখতে রাসায়নিক উপকরণ, প্রশিক্ষক বেতনসহ সর্বসাকুল্যে প্রতিমাসে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের বেতন থেকে এই টাকা নির্বাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভর্তুকি দিয়ে পুল চালু রাখা হয়েছে। সুইমিংপুলের গ্যালারি, ডাইভিংপুলসহ আরও কিছু প্রয়োজনীয় সংযোজন ও সংস্কার দরকার। পুলের জন্য কোনো কেয়ারটেকার নেই। এখানে স্থায়ী কেয়ারটেকার দরকার। এসব বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের কাছে আবেদনও জানানো হয়েছে।
যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাতাঁর পরিষদের সাবেক সম্পাদক আব্দুল মান্নান জানান, সুইমিং পুল চালু হলেও সাঁতার নিয়ে ক্রীড়া সংস্থার পরিকল্পনা ও উদ্যোগে ঘাটতি রয়েছে। যশোরে দীর্ঘদিন ধরে কোনো সাঁতার প্রতিযোগিতা নেই; নেই ওয়াটারপোলো টুর্নামেন্ট। এমনকি ট্যালেন্ট
হান্টও নেই। ফলে নতুন সাঁতারু উঠে আসছে না। আগে পুল না থাকলেও যশোর থেকে জাতীয় মানের সাঁতারু উঠে এসেছে। এখন পুল থাকার পরও সেই ধারা নেই।
যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব কবীর জানান, করোনায় দুইবছর সাঁতারসহ খেলাধুলা বন্ধ ছিল। এখন ইমিংপুল
সংস্কার করে সাঁতার চলছে। নতুনরা সাঁতার শিখছে। পাশাপাশি পুরানো সাঁতারুরা প্র্যাকটিস করছে। ফলে আমরা আশাবাদী আগামী দু’বছরের
মধ্যে যশোর আবার সাঁতারে আগের অবস্থানে উঠে আসবে। সুইমিংপুলের বড় সঙ্কট হচ্ছে, এটি রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ নেই। এ ব্যাপারে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্যালারি নির্মাণসহ কিছু সংস্কারের জন্যও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে অবহিত করা হয়েছে।