মোশাররফ হোসেন: দূর্গম গিরি কান্তার মরু দূস্তর পারাপার হে, লংঘিতে হবে নিশি রাত্রি, যাত্রীরা হুশিয়ার,,। হিন্দু নয়, মুসলিম জিজ্ঞাসে কোন জন, এ তুফান ভারি দিতে হবে পারি ,,নিতে হবে তরী পার ,,। কবি কাজী নজরুল ইসলামের এ গান কেন লিখলাম!
সাম্পধদায়িক সম্পধীতিই কেবল সভ ̈তা ও দেশ, রাষ্ট্রকে রক্ষা করে। ধর্মযুদ্ধ দেশ ও জাতির সর্বনাশ ডেকে আনে। যুগে যুগে, সৃষ্টির আদিকাল থেকে এটাই প্রমাণিত। যদিও দেশ জয়, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য আজও ধর্মীয় বিভাজন সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। এখন বাজার অর্থনীতির যুগে মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের খাদ্য,বস্ত্র, চিকিৎসা ,বাস ̄স্থানসহ সববিষয়ে উন্নত দেশসমুহ বলয়ের সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করছে। উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে বিশ্ব পরাশক্তি এ নিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অনুন্নত ,উন্নয়নশীল দেশসমুহকে সহযোগিতা না করে বরং বাজার দখলের প্রতিযোগতা করছে। এটা মানবতা বিরোধী অপরাধ।
লেখার মূল বিষয়ে ফিরে আসা যাক। গেল সপ্তাহে হিন্দুদের সার্বজনীন দূর্গপূজার সময় বাংলাদেশে সাম্পধদায়িক সম্পধীতি নস্ট করে দাঙ্গা সৃস্টির উস্কানি দিয়েছে এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ ও একাত্তুরের পরাজিত শক্তি। এর পেছনে বিদেশী শক্তি পৃষ্টপোষকতা থাকতে পারে বলে বাংলাদেশ
সরকারের ̄স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল অভিমত প্রকাশ করেন। দেশের ২২টি জেলায় সরকার দ্রুত নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োগ করে
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে পেরেছে। সাম্পধদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকবৃন্দ, আওয়ামীলীগসহ
১৪দল,বিএনপি পৃথক ভাবে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেস ক্লাব, পেশাজীবি নেতৃবৃন্দ, হিন্দু বৌদ্ধ খধীস্টিয়ান ঐক্য পরিষদসহ দেশবাসী মানব্বন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।

এর ঢেউ এসে লেগেছে আমেরিকা , কানাডা, ইউরোপ , মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমুহে। দেশে ও বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বাঙালিরা প্রতিবাদ সমাবেশ ও শোভযাত্রা, মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে। যা অব্যাহত রয়েছে । কানাডার অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদ ভবনের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ফেডারেল এমপি ন্যাথানিয়েল এরিস্কিন স্মিথ, ও প্রাদেশিক এমপিপি বাঙালি ডলি বেগম অংশ নেন। টরন্টো, আটোয়া ও মন্ট্রিয়ালসহ বিভিন্ন প্রদেশে একই কর্মসূচি পালন করেছেন প্রবাসি বাঙালিরা। সকলেই ঘটনার সাথে জড়িতদের কঠোর শিক্ষা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়ার্ক সিটির জ্যাকসন হাইটস, ওয়াশিংটনে হোয়াইট
হ্উাসের সামনে, নিউজার্সি, ডালাস , ফোরিডাসহ বিভিন্ন প্রদেশে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে সামপ্রদায়িক সন্ত্রাস রুখে দাঁড়ানোর আহবান
জানিয়েছেন প্রবাসি বাঙালিরা । তারা দোষীদের কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।
ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, ইতিহাস কী বলে,,
১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের পর গীর্জার ক্ষমতা থেকে প্রশাসনকে আলাদা করে ফরাসি সরকার ঘোষনা করেছিল, সকল নাগরিক স্বাধীনভাবে যার যার ধর্ম পালন করবে। তবে রাষ্ট্র হবে সবার।
১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পরেও মানুষ কাজের জন্য বিক্ষোভ করেছে। কার্ল মার্কসের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজে যারা অবহেলা করেছেন
তাদের গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন স্ট্যালিন। রুশ সমাজতনত্রীরা ফরাসি বিপ্লবকে বুর্জায়া বিপ্লব হিসেবে অভিহিত করে। তবে সোভিযেত
ইউনিয়নে অর্থনীতিক পরিবতর্নে জনগনের আশা পুরনে সক্ষম না হওয়ায় তা পরবর্তীতে ভেঙ্গে যায়। কমউিনিস্ট একদলীয় ব্যবস্থাও টেকেনি।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর মাও সে তুংয়ের আদর্শ থেকে সরে এসে চীন মিশ্র অর্থনীতি গ্রহন করে বিশ্বের নিয়ামক শক্তিতে পরিনত হয়েছে।এখন তারা আমেরিকা, ইউরোপসহ বিশ্ব পরাশক্তি মাথা ব্যাথার কারণ।
সৃস্টির আদিকাল থেকে ৯টি ধর্মযুদ্ধ হয়েছে খ্রীষ্ট্রিয় ধর্মের জন্মস্থান জেরুজালেম উদ্ধারের জন্য। যীশু খৃস্টের জন্মস্থান জেরুজালেম। দশম
থেকে চতুর্দশ শতাব্দী এ যুদ্ধ অব্যহত ছিল। যদিও জেরুজালেম মুসলিম, ইহুদিদেরও পবিত্র ̄স্থান। ইতালি ,ফ্রান্স, জার্মানি , ইংলান্ডসহ
ইউরোপ এ যুদ্ধে অংশ নিয়ে জেরুজালেম মুসলিমদের কাছ থেকে উদ্ধার করে। পরবর্তীতে আববাসিয় খিলাফতের সময় সালাউদ্দিন গাজী
জেরুজালেম উদ্ধার করেন।
এরপর বড়রকমের ধর্মযুদ্ধ আর হয়নি। যদিও বর্তমানে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করে চলেছে ইরান। তাদের অনুসরন করে আফগানিস্থানে তালেবানরা ক্ষমতা দখল করেছে। মুসলিম অধ্যুসিত পকিস্তানে তেহরিক আল ইসলাম সরকার পরিচালনা করছে। এরকম মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশে সরকার পরিচালনা করছে মুসলিমরা। মুসলিম ধর্মের জন্মস্থান সৌদি আরব। সৃস্টির আদিকাল থেকে মক্কা ও মদিনা মুসলিম ধর্মের তীর্থস্থান।
ঠিক তেমনি ভারত হিন্দু ধর্মের জন্মস্থান। বৌদ্ধ ধর্মের জন্মস্থান নেপাল। জেরুজালেম খৃস্ট্রানসহ বেশ কয়েকটি ধর্মের জন্মস্থান। তবে বিশ্বজুড়ে
ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছে সৃস্টির আদিকাল থেকে। উইকিপিডিয়ার সূত্র অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ৭০০ কোটি মানুষের মধ্যে খৃস্টান হলো ৩১.১১%, ইসলাম ২৪.৯০%, হিন্দু ১৫.১৬%, বৌদ্ধ ৬.৬২%, লোকজ ৫.৬%, অস্বীকৃত ২৪.৯০%।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মলাভের পর এখন জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। যার ৯০.৪ % ইসলাম,৮.৫% হিন্দু,০.৬% বৌদ্ধ,০.৪%
খৃস্টান,অন্যান্য ০.১%। সংবিধান অনুযায়ী গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষে রাষ্ট্। সকল ধর্মের মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারে। সংবিধানে সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার দেয়া হয়েছে।
তারপরও গেল দুর্গপূজার সময় কেন পূজা মন্ডপে হামলা, হিন্দুদের বাড়ি ও মন্দির ভাংচুর ,অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটল্। এসময় ৪জন হিন্দু নিহত হন। ঘটনাটি এখন তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে মন্তব্য না করে বলা যায় বিষয়টি সাংস্কৃতিক নয় রাজনৈতিক উদ্দেশ ̈প্রনোদিত। বিশ্বজুড়ে এখন এর প্রতিবাদ ও জড়িতদের কঠোর শিক্ষা প্রদানের দাবী জানিয়েছেন সকল প্রবাসি বাঙালি। বাংলাদেশেও একাত্তুরের মত রুখে দাাঁড়িয়েছে
সকল মানুষ।
সাম্পধদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় জাতীয়ভাবে সরকার যত দ্রুত দোষীদের শাস্তি প্রদান করবে ততই মঙ্গল। মনে রাখতে হবে ধর্ম যার য়ার, রাষ্ট্র
সবার। সবাইকে ধর্মপালনে সহযোগিতা করা সকল ধর্মাবলম্বীদের দায়িত্ব।
ঈদের নামাজের সময় যদি পাহাড়া দিতে না হয় তাহলে দূর্গাপূজায় কেন পূজামন্ডপ পাহাড়া দিতে হবে। বৌদ্ধদের মাঘি পূর্ণিমা, খৃস্টানদের
বড়দিনের ক্ষেত্রেও তাই। সামপ্রদায়িক সম্প্রীতি দেশ বাংলাদেশ। হাজার বছরের ঐতিহ্য ভুলে গেলে চলবেনা। মসজিদে আজান ও নামাজের সময় পূজার বাদ্য বাজানো হয়না। এটা ঐতিহাসিক চর্চা। এটাই ধর্মীয় সম্মানবোধ। হিন্দু, বৌদ্ধ ,খৃস্টানদের উৎসবেওমুসলিমদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য। ধর্মীও নেতাদের একাজে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করতে হবে।
মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তি বিধান কার্যকর করা এখন সময়ের দাবী। বাংলাদেশ সব মানুষের, ছোটদের বড়দের সকলের, গরীবের নি:স্বের, আমার এই দেশ ,,।
এখন বিশ্ব পরাশক্তি আধিপত্য বিস্তারের জন্য ধর্মকে ব্যবহারের উস্কানি দিয়ে থাকে। প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে দেশে ধ্বংসাত্মক কাজে পৃষ্ঠপোষকতা
করে। দেশপ্রেমবোধে সদা জাগ্রত থেকে সকল নাগরিকের দায়িত্ব এ কাজে বিরত থাকা। নিজের দেশকে রক্ষা করে এগিয়ে নেয়া। বর্তমানে উন্নত দেশে বর্ণবাদ ও ধর্মকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটাও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ বয়ে আনছেনা। জনগনের কল্যাণে কাজ করতে হলে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। অনুন্নত দেশকে সহযোগিতা করতে হবে। তবেই বিশ্বে শান্তির বাতাস বইবে।