একুশ পদকপ্রাপ্ত ও আন্তর্জাতিক খেয়াতিমান ফটো জার্নালিস্ট পাভেল রহমান এখন থেকে অনলাইন নিউজ পোর্টাল দূরবীণ এ নিয়মিত লিখবেন। আলো দিয়ে যিনি লিখে থাকেন। ঐতিহাসিক ও সৃজনশীল ছবি তুলে যিনি বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগিয়েছেন।
কথা হয়।, মতবিনিময় করে যিনি আমাকে উজ্জীবিত করেছেন।পেশাদার পাভেল সাধীন জীবনযাপন করতে গিয়ে কত সৃতি, অভিমান ও বেদনার কথা বলেছেন, মানুষের জয়গান গেয়েছেন। আজও মানুষ মানুষের জন্য কাজ করে এগিয়ে চলেছেন। সাহসী, সময় ও কালের কথা লিখবেন এ কলামে।
পাভেল রহমান
রাণীকে চোখের দেখা দেখতেও ভাগ্য লাগে, কিন্তু আমি ব্রিটেনের রাণী ২য় এলিজাবেথের ১৯৮৩ সালের নভেম্বরের ঢাকা সফরের সময় মহা চ্যালেঞ্জ নিয়ে যে ছবি তুলেছিলাম তা আক্ষরিক অর্থেই চোখে দেখে নয়, তুলেছিলাম ক্যামেরার লেন্সের মাধ্যমে। ছবির সাবজেক্ট ভিভিআইপি রাণী এলিজাবেথ এবং বাংলাদেশের সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরীকে বহনকারী সাদা রঙের বুলেটপ্রুফ ৬ দরজার মার্সিডিস আমার সামনে দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ধাববান। সেই ছুটন্ত ধাবমান গাড়ীর ভিতরে রাণীর ছবি তুলতে হবে। তুলতে হবে ছুটন্ত গাড়ীর চেয়েও ক্ষিপ্রতায়, সেই অর্থে হাতে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশেরও কম সময়। আমি সাবজেক্টকে ক্যামেরায় খুঁজবো না ক্যামেরায় লুক থ্রু করবো? চোখে দেখে ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখতেই তো রাণী হাওয়া, শাটার করার সময় কোথায়?
এলিজাবেথের একটি মাত্র শাটারে একটি মাত্র ক্লিকে একটি মাত্র ফ্রেম যেখানে হয়েছিলো শত ভাগ কারেক্ট, শার্প এবং সম্পূর্ণ অ্যাকশন শট। সেই অর্থে কি আমি ভাগ্যবান? ছবিটা তুলতে পারা ছিল আসলেই চরম সৌভাগ্যের। প্রথমত রাণীর গাড়িটির অবস্থান ছিল ভিভিআইপি গাড়ীর বহরে কমপক্ষে ৪০টি গাড়ীর সামনের দিকে। দ্বিতীয়ত রাণীর গাড়ীকে ঘিরে সেনাবাহিনীর তৈরি নিরাপত্তা বলয়ের মাঝে, ৮টি মোটরবাইক কম্যান্ডো দিয়ে ঘেরা এবং দ্রুত ছুটন্ত – যেখানে ৪০টি গাড়ির ৮০টি হেডলাইট ধেয়ে আসছে আমার দিকে। সেই মুহূর্তে আমার করণীয় ঠিক করে ছবি তুলতে আমি ডিটারমাইন্ড হলেও আমার জানাই নেই রাণী এলিজাবেথ গাড়ীর কোন পাশে বসেছেন – ডানে না বাঁয়ে। আমরা ৬ জন – ইত্তেফাকের ফটোসাংবাদিক বিখ্যাত রশিদ তালুকদার, আফতাব আহমেদ, মোহাম্মদ আলম আর আমি ছাড়াও ছিল আরও দুইজন। আমরা কেউই জানি না রাণীর পজিশন, কোথায় বসেছেন তিনি। একদল ডানে অন্য ফটোগ্রাফাররা বাম পাশে। আমি কোন পাশেই পজিশন নেইনি, অপেক্ষায় ছিলাম গাড়ীর বহরটির জন্য। রাতের বেলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাণীর বিমানটা টার্ম্যাকে থামার শব্দেই হৃদকম্পন শুরু হয়েছে। সেই হৃদকম্পন আরও বাড়তে লাগলো যখন গাড়ীগুলির এতোগুলি হেডলাইট আমার দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দিচ্ছে। আমি আমার করণীয়তে স্থির সংকল্পবদ্ধ – আমার ছবি চাইই চাই।

গাড়ী গুলির ইঞ্জিনের গমগম শব্দে চোখে আলোর ধাঁধা কাটতেই দেখি আর্মিদের মোটরবাইকের কর্ডন, নিরাপত্তা বলয়। আমি মুহূর্তে বুঝে ফেলি নিরাপত্তা বলয় আর রাণীর লিমোজিনের ফাঁকে আমাকে ঢুকতে হবে। এছাড়া যে আমার ছবিই হবে না, কারণ আমার হাতে ৩৫ মিলিমিটারের ফিল্ম ক্যামেরা নাইকন এফএমটু-তে লাগানো রয়েছে ২৮ মিলিমিটারের ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স। আমাকে থাকতে হবে রাণীর যতটা সম্ভব কাছাকাছি। এতে একটা বিপদ ঘটতে পারে নিরাপত্তায়। আমি আগন্তুক ক্যামেরা নিয়ে রাণীর গাড়ীর এতোটা কাছে পৌঁছতেই পারিনা। কম্যান্ডোরা নিরাপত্তার কারণে আমাকে সাংবাদিক নয়, বরং ‘এনিমি‘ ভেবে ফায়ার করতে পারে। কিন্তু আমার সেই দিকে নজর দেবার সময় কই? আমার লক্ষ্য ছবি তুলতেই হবে রাণীর। আমি ধাবমান গাড়ী এবং কম্যান্ডোর মোটরবাইকের ফাঁকে ঢুকে যাই মুহূর্তে, ক্যামেরা রাণীর বুলেটপ্রুফ জানালার দিকে শাটার করি । এতো কাছে আমার ক্যামেরার ফ্লাশের আলো জানালা ভেদ করে রানীর শরীরে গিয়ে ফিরে আসে আমার ক্যামেরায় , সেলুলয়েডের ফিতায়। জানালার কাঁচে ফ্লাশের বিন্দু মাত্র রিফ্লেক্সন হলো না। বিদ্যুত গতিতে সেই গাড়ী ছুটে বেড়িয়ে যায় আমার কাছ থেকে ৫০ হাত দূরে। আমি গাড়ীর বহর থেকে তখন ছুটে বের হয়ে যাই, আর ক্যামেরাসহ ছিটকে পড়ি আইল্যান্ডে ঘাসের উপরে!
আমি এক অর্থে সৌভাগ্যবান, রাণীকে চাক্ষুষ দেখতে না পেলেও ছবিটি আমার দ্বারা আমার ক্যামেরায় আমার উপস্থিত বুদ্ধিতে তোলা, যা ছিল আমাদের ইত্তেফাকের সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর একটি চ্যালেঞ্জ – সরকারী মিডিয়া পি আই ডি ছাড়া কেউ ছবি তুলতে পারবে না সেই আদেশের বিরুদ্ধে।
পরদিন ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় এবং ইংরেজি দৈনিক নিউ নেশানের প্রথম পাতায় ছবিটি ছাপা হয়েছিলো ৬ কলাম জুড়ে আমার নামের ক্রেডিট ‘পাভেল রহমান’ দিয়ে।
সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বার্তা সম্পাদক গোলাম সারোয়ারের সম্মুখে আমাকে অভিনন্দন জানালেন, ‘কংগ্র্যাচুলেশন্স, তুমি আমার সম্মান বাঁচিয়েছো! অভিনন্দন তোমাকে!’ সৃষ্টিকর্তা বড়ই মেহেরবান ! রানীর ছবিটি উপস্থিত সব সিনিয়ারদের হারিয়ে তিনি আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।