সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার কবল থেকে হাওড়ের বোরো ফসল রক্ষায় প্রতি বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড মাটি দিয়ে নদী ও খালের তীরে বাঁধ নির্মাণ করে। এমন অপরিকল্পিত বাঁধ বর্তমানে কৃষকের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে নষ্ট হচ্ছে হাওড়ের পরিবেশ ও প্রকৃতি। প্রতি বছর জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এলাকার কৃষক।
এ অবস্থায় বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করার কথা জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
জানা যায়, শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওড়ের মাহসিং নদীর দুই তীরে তৈরি করা হবে ফসল রক্ষা বাঁধ। কিন্তু বাঁধে বৃষ্টি পানি নিষ্কাশনের সুবিধা না থাকায় হাওড়ের ৫০০ হেক্টর জমির পাকা ধান গত বছর জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায়। এতে শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাঁধে পানি নিষ্কাশনের সুবিধা না থাকায় জেলার কানলার, নাইন্দার, পাকনার, খরচার হাওড়সহ বেশ কয়েকটি হাওড়ে জলাবদ্ধতায় বোরো ফসলের ক্ষতি হয়।
ফলে বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দুটোই ব্যাহত হয়। প্রতি বছর মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণের ফলে দেখা দিয়েছে মাটির সংকট। অন্যদিকে বর্ষায় প্রবল ঢেউয়ে বাঁধে নদী ও হাওড়ের পাড়ে নদী হারায় নাব্যতা আর হাওড়ের তলদেশের মাটি ভরাট হয়ে সৃষ্টি করে জলাবদ্ধতার।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলার কৃষি বিভাগ দুই লাখ ২৩ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। হাইব্রিড ৬৫ হাজার ২০০, উচ্চ ফলনশীল এক লাখ ৫৭ হাজার ২১০, স্থানীয় এক হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য সাত হাজার ২০২ হেক্টর বীজতলায় চারা উৎপাদনের কাজ চলছে।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিবছর মাটির বাঁধ দিয়ে হাওড় ও নদীর ক্ষতি করা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে স্থায়ী টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদির বলেন, ‘গত বছর বাঁধের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় হাওড়ের দেড় হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হয়েছে।’
একই গ্রামের আনফর আলী বলেন, ‘প্রতি বছর বাঁধে মাটি ফেলে সরকার, তবে বাঁধের মাটি হাওড়ের উত্তাল ঢেউয়ে আবারও জমিতে ও নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে নদী ও হাওড়ের তলদেশ উঁচু হয়ে যায়।’
পাগলা গ্রামের আব্দুল মালিক বলেন, ‘হাওড়ে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন। এভাবে মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করে প্রতিবছর সরকারের বিপুল টাকা খরচ হয়।’
হাওড় বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় হাওরের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি করে বলেন, ‘কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়া হাওড়ে বহু বছর ধরে সনাতন পদ্ধতিতে মাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পাকিস্তান আমলের এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার বাঁধের হিসাব এখনো টেনে নিয়ে এর ওপর নতুন করে মাটি ফেলা হয়। তাই হাওড়ে আগে বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে জরিপ চালিয়ে পরিবর্তিত তথ্য সংগ্রহ করে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে।’
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমদাদুল হক বলেন, ‘হাওড়ের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে ফ্লাট ফিউজ, রেগুলেটর, ওই টেকসই উন্নত প্রযুক্তি উপকরণ ব্যবহার করা হবে। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের জন্য রয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, চলতি বছর হাওড়ে ৩৩৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ৬৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।