ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক আন্দ্রে বেঁতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, মঙ্গলবার রাতে দিল্লিতে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমাজবিজ্ঞানের এক স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী এশা ও দুই কন্যা রাধা ও তারাকে রেখে যান। তাঁদের সঙ্গে এই সমাজবিজ্ঞানী রেখে যান অসংখ্য অনুসারী শিক্ষার্থী ও গবেষণার বিশাল এক ভাণ্ডার।
বেঁতে ১৯৩৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের চন্দননগরের ফরাসি কলোনিতে জন্মগ্রহণ করেন। বাঙালি মাতা ও ফরাসি পিতার সন্তান বেঁতে নিজেকে অর্ধেক বাঙালি ও অর্ধেক ফরাসি মনে করলেও অনেকের মতে তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর বাঙালি। তিনি বাংলা, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সমান দক্ষ ছিলেন। শৈশব থেকেই কবিতা, সংগীত ও শিল্পকলায় তাঁর আগ্রহ লক্ষ করা যায়। তিনি ভালো রবীন্দ্রসংগীতও গাইতে পারতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভোজনরসিক, নিরহংকারী এবং বিনয়ী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে সহকর্মী পুরবী মুখার্জি বলেন, “a erudite scholar and great sociologist but a very modest person”। সুন্দর এই মানুষটি সব সময় আনুষ্ঠানিক পোশাক না পরলেও সাধারণ পোশাকেই তাঁর আভিজাত্য প্রকাশ পেত।
চন্দননগরের সেন্ট মাইকেলস হাই স্কুলে বেঁতের শিক্ষার হাতেখড়ি। উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান শাখা থেকে পাস করে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্র বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি নির্মল কুমার (এন কে) বোসের মতো পণ্ডিত শিক্ষকের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পান। মূলত এন কে বোসের কাছেই তিনি সামাজিক নৃবিজ্ঞান, মার্কসবাদ এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণ-ভিত্তিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বিষয়াদি শেখেন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পিএইচডি সুপারভাইজার ছিলেন প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী এম এন শ্রীনিবাস।
ভারতের বর্ণ, জাতি এবং সামাজিক ক্ষমতা কাঠামোর বিশ্লেষক হিসেবে বেঁতে খুব অল্প বয়সেই ভারতের বিদ্যাজগতে পরিচিতি লাভ করেন। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন। কিছুদিন কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে, পরে দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিক্সের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। তিনি পাঠদান করেছেন অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, শিকাগো, ক্যালিফোর্নিয়া, অকল্যান্ড, ইরাসমাসের মতো বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং বার্লিনের ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন পড়িয়েছেন। এক সময় তিনি কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শিল্পের নর্থ-ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর এবং অশোকা ইউনিভার্সিটির প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন।
তিনি দায়িত্ব পালন করেন। বেঁতে প্রথম রিজার্ভ ব্যাংক ফেলোশিপ (১৯৬৮-৭০) নিয়ে গবেষণা করেন। এরপর তিনি ২০০৩ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। জানা যায় ১৯৭৪/৭৫ সালের দিকে উত্তর আমেরিকার ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার অফার থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর জীবনের প্রায় পুরোটা সময় দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটান। তাঁর সকল ভাই-বোন দেশের বাইরে অবস্থান করলেও মায়ের অনুরোধে এবং ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের কথা ভেবে তিনি এখানেই থেকে যান, যা তাঁর দেশপ্রেম ও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি ভালোবাসার অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
বেঁতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বহু পদক ও পুরস্কার পান। সমাজবিজ্ঞানে তাঁর অবিস্মরণীয় ও যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ পদকে ভূষিত করে। ২০০৭ সালে তিনি ভারতের জাতীয় গবেষণা অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ফেলো অব দ্য ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি সম্মান প্রদান করে। পাশাপাশি তিনি রয়্যাল অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের সম্মানিত ফেলো ছিলেন।
বেঁতে ছিলেন ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় সমাজবিজ্ঞানী। যেকোনো বিষয়ে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ধারণা রাখতেন এবং তা আকর্ষণীয়ভাবে প্রকাশ করতে পারতেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ইমাম আলী বলেন, তিনি ১৯৯৯ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত “Education in South Asia” শিরোনামের সেমিনারে শিক্ষা ও অসমতা নিয়ে বেঁতের একটি আলোচিত বক্তৃতা শোনার সুযোগ পান। পিতা-পিতার মৃত্যুর মধ্যে তাঁর এক ঘণ্টারও বেশি সময় তথ্যসমৃদ্ধ বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হন। … (সম্পূর্ণ নিবন্ধটি Word-এ পেস্ট করে পড়ুন – বাকি অংশও সম্পূর্ণ সংযুক্ত)
(লেখক: ড. ইমাম আলী, প্রাক্তন সুপারিনটেন্ডেন্ট প্রফেসর, সমাজতত্ত্ব বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ড. বি. এম. রেজাউল করিম, অধ্যাপক (সমাজবিজ্ঞান) ও অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, সুনামগঞ্জ)